নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা ও আমাদের সচেতনতা
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৭:১৯
খাদ্যের পেছনে মানবজাতির নিরন্তর ছুটে চলা। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি এ চলার শেষ নেই। ক্ষুধা হচ্ছে মানুষের জীবনের অনিবার্য পরিণতি, খাদ্য হচ্ছে তার অবিচ্ছেদ একটি অংশ। তাই ক্ষুধা ও খাদ্য একে অন্যের পরিপূরক। ক্ষুধার বর্ণনা করতে গিয়ে কবি সুকান্ত পূর্ণিমার চাঁদকেও একখন্ড রুটির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্ষুধা নিবারণের জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন তেমনি রোগ তথা অকাল যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য নিরাপদ খাদ্যের প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- কাঁটাচামচ দিয়ে খেতে গিয়ে তোমরা খাওয়ার একটা আনন্দ থেকে বঞ্চিত হও। হাত দিয়ে খাদ্য স্পর্শ করেই খাবারের সঙ্গে কোর্টশিপ, আঙুলের ডগা দিয়েই স্বাদ গ্রহণের শুরু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন যে, হাত দিয়ে না খেলে কিংবা আঙ্গুলের ডগায় কোন খাবার না লাগলে খাবারের স্বাদ সঠিকভাবে বোঝা যায় না। কিন্তু বিপত্তিটাও আবার একই জায়গায়। হাত পরিস্কার না থাকলে খাদ্য গ্রহণে যত সমস্যার সৃষ্টি হয় তাতে একজনের সূস্থভাবে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।
টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোঁয়ার বৈশ্বিক হার মাত্র ১৯%। টয়লেট ব্যবহারের পর যারা ভালো ভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোঁয় না তাদের মাধ্যমে E. coli, Salmonella, and norovirus ব্যাকটেরিয়া খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। উক্ত জীবানুগুলোর কারণে মানুষের ডায়রিয়া,টাইফয়েড এবং পেটে ব্যথা বা পেট মোচড়ানো রোগ হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে ডায়রিয়ায় ২০২৩ সালে সারা বিশ্বে ৪,৪৩,৮৩২ জন শিশু মারা যায়। বাংলাদেশে ২০১৮ সালের এক হিসেবে দেখা যায় ডায়রিয়ায় ৬৭৫১ জন শিশু মারা গেছে। আমাদের দেশে এখনও ৩% লোক খোলা জায়গায় মল ত্যাগ করে এবং ১৯৯০ সালে এই হার ছিল ৩৪%। এক গ্রাম মলে ১০ মিলিয়ন ভাইরাস এবং ১ মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়াসহ অন্যান্য রোগ জীবানু থাকতে পারে। ২০১৯ সালে আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা যায়, পথের পাশের সাধারণ হোটেল ও খাবার দোকানের শতকরা ৭১.৫ ভাগের খাবারই মানহীন এবং অস্বাস্থ্যকর৷ পথ খাবারের ৫৫ ভাগেই পাওয়া গেছে জীবাণু। আর খাবার বিক্রেতা ৮৮ ভাগের হাতে জীবণু বহন করে। এসব খাবার দোকানে সাধারণত নিম্নবিত্ত লোকজন খেয়ে থাকেন৷ উইকিপিডিয়ার মতে বাংলাদেশে ২০২১ সালে হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার। ২০২১ সালে হোটেলে কর্মরত জনবল ২০ লাখ ৭২ হাজার লোক। বিভিন্ন হোটেল বা রেস্তোরায় যারা খাবার তৈরী করে বা পরিবেশন করে তারা বাথরুম ব্যবহার করার পর সাবান দিয়ে যদি হাত পরিস্কার না করায় তাদের দ্বারা এসব রোগ জীবানু খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। খাবার পরিবেশনের টেবিল চাকচিক্য থাকলেও হোটেল কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা ও বাথরুমের অবস্থা অত্যন্ত করুন। আবার গ্রামে বা মফস্বল শহরে যে হোটেল বা রেস্তোরা রয়েছে সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশরুম নাই। তারা কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় মসজিদ বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের ওয়াশরুম ব্যবহার করে থাকে। সেখানে কোন টিস্যু পেপার বা সাবান নেই একং ওয়াশরুম গুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় পরিস্কার না করায় ময়লার ওপরেই আরেকজন ওয়াশরুম ব্যবহার করেন এবং তিনি বা তারা নাক বন্ধ করে বা নাকে হাত দিয়ে বাথ রুম সাড়া মাত্র বেরিয়ে পড়েন ফলে তারা ব্যক্তিগত পরিস্কার পরিচ্চন্নতা কিংবা হাত ধোয়ার মতো যথেষ্ট সময় পান না। এই অপরিস্কার হাতেই আবার সিঙ্গারা, পারোটা, রুটি ইত্যাদি তৈরীর ময়দার মণ্ড মাখতে থাকেন কিংবা সবজি কাটেন এবং ঐ হাত দিয়েই গ্লাসের ভিতরে আঙ্গুল দিয়ে গ্লাস বা চায়ের কাপ ধরে তা পরিবেশন করেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে দূষিত মল কিংবা তার তেল সহজেই খাবারের সঙ্গে মিশে অন্য মানুষের পেটে যাচ্ছে।প্রতি বছর আমেরিকায় ৪৮ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য বাহিত রোগে আক্রান্ত হয় যার অর্ধেকেই হোটেলের শেফ থেকে পরিবেশনকারিদের যথাযথভাবে হাত না ধোঁয়ার কারণে হয়ে থাকে।
খাদ্য দূষণ কিংবা দূষিত খাবার খেয়ে প্রতি ১০ জনে একজন অসুস্থ হয় এবং প্রতিবছর ৪,২০,০০০ হাজার লোক মারা যায়। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুসারে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে অনিরাপদ জনিত খাদ্য গ্রহণের ফলে জনশক্তির উৎপাদনশীলতা কমে য়ায় যার আর্থিক মূল্য ৯৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চিকিৎসা ব্যয়ে প্রতি বছর ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। ৫ বছরের কম বয়সী ৪০% শিশু খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রতি বছর ১২৫,০০০ জন মারা যায। ১৯৮৮ সালে চীনে দূষিত ক্ল্যামস খাওয়ার কারণে তিন লাখেরও বেশি লোক হেপাটাইটিস এ আক্রান্ত হয়। ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দূষিত আইসক্রিম খাওয়ার কারণে সালমোনোলিস রোগে আক্রান্ত হয় ২,২৪,০০০ লোক। ১৯৮৫ সালে ক্যালির্ফোনিয়ায় দূষিত পনির খাওয়ার কারণে ৪৮ জন লোক মারা যায়।
ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়ার শত শত জাত বা প্রকরণ আছে যার সবগুলো ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কিছু স্ট্রেইন বা জাত আছে যেগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর। আজ থেকে ২৪০০ বছর আগে হিপোক্রেটিস, ফাদার অব মর্ডান মেডিসিন, বলেছেন ‘Let your food be your medicine’, অর্থাৎ খাদ্যই তোমার ওষুধ, ওষুধই তোমার খাদ্য। কেহ অপাস্তুরাইজড বা কাচা দুধ, অধৌত কাঁচা ফল এবং শাক সবজি. দূষিত ফলের রস এবং অর্ধ রান্না মাংস খেলে ক্ষতিকার ই.কোলাইয়ের সংক্রমণে হেমোলিটিক ইউরেমিক সিনড্রোম রোগে আক্রান্ত হতে পারে। রেস্টুরেন্টের বাসী খাবার এবং যথাযথভাবে ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণ না করলে এ ধরণের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বেশি হয়। এ ধরণের রোগে বিশেষ করে শিশুদের খাদ্য নালীতে শিঘা নামক একধরণের বিষাক্ত পদার্থ সৃষ্টি করে। বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবে রক্তনালী ও রক্ত কণিকা ধ্বংস হয়ে রক্তকে জমাট বাঁধিয়ে ফেলে। কোন কোন ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হয়ে যায়। এ ধরণের ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়া মানুষসহ বিভিন্ন পশু পাখীর মলে বেশি পাওয়া যায়।
টাইফয়েড এক ধরণের সংক্রামক রোগ। দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। টাইফয়েডের জন্য দায়ী হলো সালমোনেলা টাইফি নামে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া। রানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্ট মারা গিয়েছিলেন এই রোগে। তাদের পুত্র সপ্তম এডওয়ার্ডও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসেন। রাজা প্রথম হেনরিও এই রোগের শিকার হয়েছিলেন। ১৮৯০-এর দিকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতেও দেখা যায় তার দাপট, যদিও সে ক্ষেত্রে দায়ী ছিল দুর্বল পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল মেরি ম্যালোন, ইতিহাসে যিনি ‘টাইফয়েড মেরি’ নামে পরিচিত তার মাধ্যমে। তিনি মানুষের বাসায় পাঁচক হিসেবে কাজ করতেন এবং তার মাধ্যমে টাইফয়েড রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তার দেহে এ রোগের লক্ষণই প্রকাশ পায় নি। যে রোগ ছড়ায় দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে, সেই রোগ যদি বাহক হিসেবে পায় কোনো রাঁধুনিকে, তাহলে পরিস্থিতি কেমন ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও টাইফয়েড ছিল প্রাণঘাতী এক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ১০ শতাংশ মারা যেত, রোগটা মূলত দেখা যেত বড় শহরের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মধ্যে। মেরি যে বাড়িতেই কাজ করতেন সেই বাড়ির লোকজনই টাইফয়েডে আক্রান্ত হতো। কিন্তু রোগের কারণ কেউ আবিস্কার করতে পারে নি। পরে অবশ্য আবিস্কৃত হলো এই মেরিই টাইফয়েড রোগের বাহক।
মাছি মানুষসহ পশু পাখির মলমূত্রে বেশি সময় পড়ে থাকে ফলে মাছির পা, পাখা ও শরীরের অন্যান্য অংশে রোগজীবাণু লেগে থাকে। রেস্টুরেন্টে অনেক সময় খাবার খোলা অবস্থায় রাখা হয় ফলে মাছি খাবারের উপর বসে বিভিন্ন ধরণের রোগ জীবাণু ছাড়ায়। মৃত পশুপাখির শরীরের কাছে সচারচর নীল মাছি উড়তে দেখা যায়। শহর এলাকায় নীল মাছি চোখে পড়ে বেশি। মাংসের দোকান, পশু জবাইয়ের জায়গা এবং আবর্জনার স্তূপের কাছে নীল মাছির উপদ্রব বেশি। মাছির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে আমেরিকান গবেষকরা বলছেন, ঘরের মাছি আর নীল মাছি মিলে ৬০০ এর বেশি বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু বহন করে। এর মধ্যে অনেক জীবাণু মানুষের শরীরে সংক্রমণের জন্য দায়ী, যার মধ্যে রয়েছে পেটের অসুখের জন্য দায়ী জীবাণু, রক্তে বিষক্রিয়া ঘটায় এমন জীবাণু এবং নিউমোনিয়ার জীবাণু। সেজন্য হোটেল গুলোতে খোলা অবস্থায় রাখা খাদ্য কোনো অবস্থাতেই গ্রহণ করা উচিত না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, অনিরাপদ স্ট্রিট খাবারের কারণে প্রতিদিন বিশ্বে অন্তত ১৬ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়। আর বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ লোক খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের একটি গবেষণা পত্র যা BACTERIA LADEN STREET FOOD (CHATPATI) AND THEIR MULTIPLE ANTIBIOTIC RESISTANCE INDEX শিরোনামে রিসার্চ গেটে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, গড়ে প্রতি প্লেট চটপটিতে ৭ কোটি ২০ লাখ ই-কোলাই, সাড়ে ৭০০ সালমোনেলা ও সাড়ে ৭০০ ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। ছোলামুড়িতে ই-কোলাই পাওয়া গেছে সাড়ে ৭ লাখ ৪০ হাজার, সালমোনেলা ২ হাজার ও ভিব্রিও ৩০ লাখ। স্যান্ডউইচে ই-কোলাই পাওয়া গেছে ২ হাজার, সালমোনেলা ২ হাজার ও ভিব্রিও ১ কোটি ৬০ হাজার। আখের রসে ই-কোলাই পাওয়া গেছে ৬৫ হাজার, সালমোনেলা ১৭ হাজার ও ভিব্রিও ১৩ হাজার। অ্যালোভেরা সরবতে ই-কোলাই পাওয়া গেছে ৫৬ হাজার, সালমোনেলা ১৮ লাখ ও ভিব্রিও ১৪ হাজার। মিক্স সালাদে ই-কোলাই পাওয়া গেছে ১ হাজার ৮০০, সালমেনোলা ৫১০ ও ভিব্রিও ৩০০। গবেষণায় জানা গেছে, এসব স্ট্রিট ফুড খেয়ে প্রতি ১০ হাজার মানুষে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার কারণে ২ জন, সালমেনোলা ব্যাকটেরিয়ার কারণে ৪ জন ও ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়ার কারণে ১ জন অসুস্থ হচ্ছেন।
২০১৫ সালে দিল্লির ইন্সটিটিউট অব জিনোমিকস অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজি-র বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় ব্যাংক নোট বা টাকায় অন্তত ৭৮ রকম বিপজ্জনক জীবাণুর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছিলেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্রী নিশাত তাসনিম প্রায় ছয় মাস ধরে বাজারে প্রচলিত টাকা ও কয়েন নিয়ে গবেষণা করে এসব মুদ্রায় ই-কোলাই জাতীয় ব্যাকটেরিয়া পেয়েছিলেন। কাগজের টাকার মধ্যে গ্রাম পজেটিভ, গ্রাম নেগেটিভ-দুই ধরনের জীবাণু পাওয়া যায়। টাকায় বিদ্যমান অন্যান্য জীবাণুর মধ্যে রয়েছে স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকোলোসিস, ভিব্রিও কলেরি, করিনেব্যাক্টেরিয়াম, মাইক্রোকক্কাস, ক্লেবসিলা, সালমোনেলা, সিওডোমোনাস ও বেসিলাস প্রজাতির ক্ষতিকর জীবাণু। এসব ক্ষতিকর জীবাণুর কারণে খাদ্যবিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মের সংক্রমণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাসহ প্রাণঘাতী রোগ মেনিনজাইটিস ও সেপ্টেসেমিয়া সৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু মানুষ সরাসরি হাত দিয়ে টাকা ধরেন এবং অনেক সময় মুখের থুথু দিয়ে গণনা করেন। তাই টাকার মাধ্যমে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি এর ২০০৭ সালের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, সেদেশে টাকা গণণার পর মাত্র ৩০% মহিলা এবং ১৯% পুরুষ যথাযথভাবে হাত ধুয়ে পরিষ্কার করেন। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি ৫ জনে ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অর্থাৎ ২১ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার গ্রহণের কারণে লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজিন ব্যাকটেরিয়া; আধা সেদ্ধ কিংবা অপাস্তুরিকৃত দুধ খাওয়ার কারণে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করছে; কিংবা খাবারে দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে শিগেলা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। কিছু কিছু দোকানে সকালে রান্না করা খাবার সারা দিন ধরে বিক্রি করা হয়। এতে ক্লোসট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেন ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বমি ও ডায়রিয়ার ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে প্রতিবছর তিন লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং ৫০ হাজার লোক ডায়াবেটিসে এবং আরও ২ লাখ লোক কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।
খাবার ক্ষেত্রে আর একটি সচেতনতার অভাব হলো অতিরিক্ত লবণ বা সোয়িয়াম ক্লোরাইড গ্রহণ। পেশি এবং স্নায়ুর কার্যকারিতা সচল রাখতে এবং দেহে পানি ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের ভারসাম্য রক্ষায় সোডিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্লোরাইড দেহের তরল পদার্থের নিয়ন্ত্রণ, pH এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রোলাইট এর মাত্রা বজায় রাখা সহ বিভিন্ন কোষীয় কার্যক্রমে সহায়তা করে থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি খাবার লবণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। এক সময় চীনে লোকজন আত্মহত্যার জন্য ৫০০ গ্রাম লবণ খেত। একজন জাপানী আত্মহত্যাকারি মহিলাকে নিয়ে রিসার্চ গেটের একটি গবেষণাপত্র An autopsy case of salt poisoning from drinking a large quantity of shoyu অনুসারে উক্ত মহিলা অটোপসি’র রিপোর্ট থেকে জানা যায় উক্ত মহিলা আত্মহত্যার জন্য একবারেই ১০০০ মিলি এর ১ বোতল shoyu গ্রহণ করেছিল যাতে ১৬০ গ্রাম লবণ ছিল এবং উক্ত পরিমাণ লবণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান Tedros Adhanom Ghebreyesus বলেছেন প্রতি বছর খাবারে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে ২০ লাখ লোক মারা যায়। তাছাড়াও অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের সাথে হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্ত চাপ এবং স্ট্রোকের ঝুকির মাত্রা বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুসারে একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক ২০০০ মিলিগ্রাম বা ৫ গ্রাম বা ১ চা চামুচের চেয়ে কম লবণ গ্রহণ করা উচিৎ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৪ টি দেশের মধ্যে মাত্র ০৯ টি দেশ- ব্রাজিল, চেক প্রজাতন্ত্র, চিলি, লিথুনিয়া, মালয়েশিয়া, মেস্কিকো, সৌদি আরব, স্পেন ও উরুগুয়ে লবণ গ্রহণের ক্ষেত্রে WHO এর গাইড লাইন পুরোপুরি মেনে চলে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণা পত্র Salt Intake in an Adult Population of Bangladesh এর মতে বাংলাদেশে খাবার লবণ গ্রহণের মাত্রা অনেক বেশি যা দৈনিক ১৭ গ্রাম । এ মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাত্রার চেয়ে নি:সন্দেহে অনেক বেশি যা আমাদের জনস্বাস্থ্যের অত্যন্ত ভয়াবহ। একজন ৭০ কেজি ওজনের সূস্থ স্বাভাবিক যুবক যদি ৩৫-৭০ গ্রাম খাবার লবণ একসাথে খেয়ে থাকে তাহলে তার মৃত্যু হতে পারে। এ থেকে সহজে অনুমান করা যায় আমাদের লবণের গ্রহণের মাত্রা কতটা ঝুকিপূর্ণ।
বর্তমান শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং মানুষের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা। বিশ্ব সংস্থার মতে, একটি দেশে খাদ্যের পরিমাণ কতটা এবং তার সহজলভ্যতা ও ব্যবহার প্রক্রিয়া কেমন, তার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা মানেই খাদ্যপণ্যের প্রাপ্যতা, প্রাচুর্যতা, সমবণ্টন ব্যবস্থা এবং ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করা। জীবন বাঁচানো ও সূস্থ থাকতে খাদ্য গ্রহণ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে আরো বেশি সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে।
লেখক: অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম
সারাবাংলা/এএসজি