ঈদ যেন সুন্দরবনে হরিণ শিকারের মহোৎসব!
২৮ মার্চ ২০২৫ ১৭:১৯ | আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৫ ২০:০৯
খুলনা: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে হরিণের। মায়া ও চিত্রা নামের দুই প্রজাতির হরিণের দেখা যায় এ বনে। এরমধ্যে চিত্রা হরিণের সংখ্যাই বেশি। এই সুন্দরবনে দুই যুগ আগের তুলনায় হরিণের সংখ্যা বেড়েছে। তবে হরিণের সংখ্যার সঙ্গে বেড়েছে শিকারির দৌরাত্ম্যও। আর ঈদ যেন হরিণ শিকারের মহোৎসব!
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপের তথ্যমতে, বর্তমানে সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে। এর আগে ২০০৪ সালের জরিপে হরিণের সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার। তবে জরিপে হরিণের সংখ্যা বাড়লেও সুন্দরবনে শিকার বন্ধ হচ্ছে না। সারা বছরই হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরা শিকারিচক্র। তবে ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ওই শিকারিচক্র।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সুন্দরবনে সারা বছরই হরিণ শিকার করে কয়েকটি চোরা হরিণশিকারিচক্র। উৎসব আসলেই সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় বেপরোয়া হয়ে উঠে কয়েকটি স্থানীয় চোরা শিকারিচক্র।
বন বিভাগ ও পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। সুন্দরবন প্রভাবিত বিশেষ করে খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করেন। এসব উপজেলার গ্রামগুলোতে বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। তাদের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ সুন্দরবনকেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বন বিভাগ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে ৭৫৭ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৩৬টি। আসামি করা হয়েছে ৮৪ জনকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫১৪ কেজি ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২৩ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পেশাদার শিকারিরা গোপনে সুন্দরবনে ঢুকে নাইলনের দড়ির ফাঁদ পেতে রাখেন। চলাচলের সময় হরিণ সেই ফাঁদে আটকে যায়। এসব শিকারিরা বনে প্রবেশের সময় ফাঁদ বহন করেন না। জেলের ছদ্মবেশে তারা মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতর বসে সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করেন। তারপর হরিণের যাতায়াতের পথে ফাঁদ পেতে রাখেন। চলাচলের সময় প্রাণীগুলো সেই ফাঁদে আটকা পড়ে। পরে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ পেলে তারা আবার শিকারে আসেন।
তারা আরও বলেন, এসব শিকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস। ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। চোরাশিকারিরা তখন জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন। সুন্দরবন-সংলগ্ন জনপদে সারা বছরই হরিণের মাংসের চাহিদা রয়েছে। উৎসব-পার্বণ ছাড়াও কেউ কেউ স্বজনদের হরিণের মাংস উপহার দেন। আবার বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্যও কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস সরবরাহ করা হয়। হরিণের চামড়া-শিং সৌখিনব্যক্তিরা সংগ্রহ করে ড্রইংরুম সাজান। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার হচ্ছে হরহামেশাই। তবে উৎসবে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় বেপরোয়া হয়ে উঠে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরা শিকারিচক্র।
তিনি আরও বলেন, যে পরিমাণ হরিণের মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দুই একটি অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরাশিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের মাংস বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হন, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন। তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বনজ সম্পদ আহরণসহ নানা উপায়ে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় কমেছে। যে কারণে বনজীবীদের কেউ কেউ জীবীকার তাগিদেও এসব কাজে লিপ্ত হচ্ছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে একশ্রেণির অসাধু লোকজন সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠন করার চেষ্টা চালায়। এ সময় চোরা হরিণ শিকারিরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে তাদের দমনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের সব কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থল ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং পর্যটন এলাকাগুলোতে ইকোট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সারাবাংলা/এইচআই