বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তনসহ সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ১৪ দফা দাবি
৮ মার্চ ২০২৫ ১৮:২৯ | আপডেট: ৮ মার্চ ২০২৫ ১৯:৩০
ঢাকা: একশ’ বছরের বেশি সময়ে বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করলেও নারী পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিপীড়ন, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। এর ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীকে অধ:স্তন ও মর্যাদাহীন করে রাখার চেষ্টায় সবসময় সচেষ্ট। এর ফলে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ নারীর সকল ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণে অগ্রসর বা প্রস্তুত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ কম।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে শনিবার (৮ মার্চ) আয়োজিত সমাবেশে এসব তথ্যই উঠে আসে নারী নেত্রীদের বক্তব্যে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ ও র্যালি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারী একটা কঠিন সময় পার করছে। কিন্তু আন্দোলনের ফসল সেই নারীদের মুখ থেকে কোনো কথা শুনতে না পাওয়া আমাদের ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে।’
নারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সমসুযোগ তৈরি করে নিতে হবে। এই দুঃসময়কে ভয় পাওয়া যাবে না। এই দুঃসময় ভেদ করে আলো ছিনিয়ে আনতে হবে। বাঙালি কোনো ধর্ষণ, খুন কিংবা নিপীড়নের কাছে মাথানত করবে না। সবাইকে একসঙ্গে এই প্রতিকূলতা ভেঙে এগিয়ে যেতে হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘এখনো সময় আছে নারীসমাজের পাশে দাঁড়ান। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি না হলে শুধু নারীরাই নয়, যারা শাসন ক্ষমতায় আছেন, তারাও নিরাপদে থাকবেন না, নৈরাজ্যের কাছে ভেসে যাবেন।’
মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেন, ‘ আমরা দেখতে পাচ্ছি, শিশু ধর্ষণ ও নারী হত্যার সঙ্গে জড়িতরা জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছে। এটা অনেক দুঃখজনক। তারা কীভাবে প্রশ্রয় পাচ্ছে? সরকারের পক্ষ থেকে কেন সুস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে না? কেন আশ্বস্ত করা হচ্ছে না? আমরা এই সমাজ চাই না। এই সমাজ গ্রহণও করব না। নারীর অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমি বলেন, ‘শাহবাগে নারী শিক্ষার্থীকে পোশাক নিয়ে হেনস্তা করার এবং সাইবার বুলিংয়ের এত সাহস কোথা থেকে পায়? রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা। কিন্তু ধর্ষক নিপীড়কেরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি নারীরা আবার ঘরে ফিরে যাবে? নারীদের জায়গা কি তাহলে সেই ঘরের কোনাতেই থাকবে? ’
সমাবেশে ‘নারীর ক্ষমতায়নে চাই সহিংসতামুক্ত জীবন, সম–অধিকার, সমমর্যাদা এবং সম সুযোগ’ শীর্ষক ঘোষণা পাঠ করেন কর্মজীবী নারী কাজী গুলশান আরা দীপা। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী বিদ্বেষের প্রকাশ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর প্রতি গণহেনস্তা ও মব সংস্কৃতির যে চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসছে, তা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই পরিস্থিতি নারীদের নির্ভয়ে চলাফেরার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। নারীর অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।’
৬৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ১৪টি দাবি তুলে ধরেন কর্মজীবী নারী সংগঠনের প্রতিনিধি কাজী গুলশান আরা দীপা।
সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ১৪ দফা দাবি হলো– বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তন করে সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন চালু করা; সম্পদ-সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার ও সম-অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা; নারীর অবৈতনিক পারিবারিক কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তা জিডিপিতে অর্ন্তভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া; জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা এবং সংরক্ষিত আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকা পুনঃনির্ধারণ করা; নীতি নির্ধারণীর সব পর্যায়ে নারীর সম-অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা; গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯০ নম্বর অনুচ্ছেদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা; নারী গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিষয়টিকে শ্রম আইনে অর্ন্তভুক্ত করা; উত্ত্যক্তকরণ ও যৌননিপীড়ন বন্ধে হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাস্তবায়ন ও রায়ের আলোকে আইন প্রণয়ন করা; পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ এর বাস্তবায়ন করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নারীকে অবমাননা করে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ বা প্রচার করা হয় তা নিয়ন্ত্রণ করা; অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা; সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী আইন দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা; জাতিসংঘের সিডও সনদের অনুচ্ছেদ-২ ও ১৬(১) (গ) এর ওপর থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা; বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৭-এর মেয়ের বিয়ের বয়স সংক্রান্ত বিশেষ বিধান বাতিল করে আইনের বাস্তবায়ন করা; প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করা।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, জাতীয় নারী শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক সাহিদা পারভীন শিখা, শক্তি ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক নিলুফা বেগম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা প্রমুখ। এছাড়াও সমাবেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান ও আবৃত্তি হয়।
পরে বৈষম্য বিরোধি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
সারাবাংলা/এফএন/আরএস